ঘুম কি অত্যাবশ্যকীয় অথবা শুধুই প্রয়োজন?
চিরায়ত গ্রামবাংলার ছড়ায় ঘুমের গুরুত্ব বারবার উঠে এসেছে। যেমন:
"ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি মোদের বাড়ি এসো,
খাট নাই পালঙ নাই, চোখ পেতে বস।"
অথবা,
"খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে,
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেবো কিসে?"
কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত পঙক্তিতেও আমরা পাই:
"ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি ঘুম দিয়ে যেয়ো,
বাটা ভ'রে পান দেব, গাল ভ'রে খেয়ো।"
অনেকেই ঘুমকে শুধুমাত্র একটি রাজকীয় অভ্যাস বা বিলাসিতা মনে করেন। কারও ধারণা, ঘুম মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট করে এবং অলস মানুষেরাই বেশি ঘুমায়। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই?
রাত জেগে পড়াশোনা, গবেষণা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব আমাদের স্বাস্থ্যের উপর পড়ে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকাই কি সফলতা? এমন সফলতা, যা পরবর্তীতে আপনাকে পরনির্ভরশীল করে তোলে এবং সঞ্চিত অর্থ চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য করে? তাই প্রশ্ন হলো, আপনি কোনটিকে প্রাধান্য দেবেন, রুগ্ন স্বাস্থ্য ও প্রাচুর্য, নাকি সুস্বাস্থ্য ও সফলতা?
ঘুম আসলে কী?
বিজ্ঞানীদের মতে, ঘুম এক ধরনের অচেতনতা, যেখানে অনুভূতির সক্রিয়তা এবং মাংসপেশির কার্যকলাপ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তবে এটি সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থাও নয়।
আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন ২০২১ সালে ঘুমকে স্বাস্থ্যের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বলে ঘোষণা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য যেমন পুষ্টি ও শরীরচর্চা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী নিদ্রাহীনতা নিম্নশ্রেণির জীবজগতে মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে।
কেন ঘুম জরুরি?
জাগ্রত অবস্থায় আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় ভারসাম্য ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। ঘুম সেই ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি করে।
ঘুমের প্রধান উপকারিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- শরীরের শক্তি সংরক্ষণ
- জৈবিক দেহঘড়ি সচল রাখা
- প্রয়োজনীয় হরমোনের কার্যকারিতা বজায় রাখা
- নিউরনের সিনাপটিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা
- অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তর করা
অপর্যাপ্ত ঘুমের ফলে দেখা দিতে পারে:
- অবসন্নতা
- ক্লান্তি
- খিটখিটে মেজাজ
- হতাশা
- আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা
- চিন্তাশক্তি হ্রাস
- স্ট্রেস হরমোন বৃদ্ধি
- হৃদ্রোগ ও রক্তনালীর ঝুঁকি বৃদ্ধি
ঘুমের স্তর
আমাদের ঘুম মূলত দুইটি পর্যায়ে বিভক্ত।
১. নন-রেম (Non-REM)
ঘুমানোর পর থেকে গভীর ঘুমে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত সময়কে নন-রেম ঘুম বলা হয়।
এই পর্যায়ে:
- মস্তিষ্ক তুলনামূলক কম সক্রিয় থাকে
- শরীর বিশ্রামে থাকে
- হরমোন নিঃসরণ হয়
- দিনের ক্লান্তি দূর হয়
নন-রেম ঘুমের চারটি স্তর রয়েছে:
প্রথম স্তর:
মাংসপেশি শিথিল হয়, হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়।
দ্বিতীয় স্তর:
হালকা ঘুম। সহজেই ঘুম ভেঙে যায় এবং আশপাশ সম্পর্কে সচেতনতা থাকে।
তৃতীয় স্তর:
স্লো ওয়েভ স্লিপ। রক্তচাপ কমে যায়। অনেক সময় মানুষ ঘুমের ঘোরে হাঁটে বা কথা বলে।
চতুর্থ স্তর:
গভীর স্লো ওয়েভ স্লিপ। ঘুম সহজে ভাঙে না।
২. র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM)
মোট ঘুমের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সময় রেম ঘুমে কাটে।
এই পর্যায়ে:
- মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে
- মাংসপেশি শিথিল থাকে
- চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে
- প্রায় ৮০ শতাংশ স্বপ্ন দেখা হয়
শিশু এবং মানসিক চাপমুক্ত মানুষের ক্ষেত্রে রেম ঘুম তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
মানসম্মত ঘুমের উপকারিতা
ভালো ঘুম:
- মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে সংযোগ উন্নত করে
- নতুন নিউরন তৈরিতে সাহায্য করে
- স্মৃতিশক্তি শক্তিশালী করে
- চিন্তাশক্তি উন্নত করে
অপর্যাপ্ত ঘুমের ফলে দেখা দিতে পারে:
- অতিরিক্ত রাগ
- বুকজ্বালা
- পেপটিক আলসার
- বমি বমি ভাব
- আইবিএস
- ডায়রিয়া
- কোষ্ঠকাঠিন্য
হরমোনের ওপর ঘুমের প্রভাব
নন-রেম ঘুম:
- গ্রোথ হরমোন
- থাইরয়েড হরমোন
- মেলাটনিন
এর নিঃসরণকে প্রভাবিত করে।
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত নন-রেম ঘুম না হলে নারীদের ক্ষেত্রে:
- প্রজেস্টেরন ঘাটতি
- ইস্ট্রোজেন ঘাটতি
- অনিয়মিত মাসিক
- ব্যথাযুক্ত মাসিক
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
- যৌন আগ্রহ হ্রাস
- বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি
বৃদ্ধি পেতে পারে।
ঘুম ও ওজন বৃদ্ধি
দীর্ঘদিন ঘুম কম হলে:
- কর্টিসল হরমোন বৃদ্ধি পায়
- রক্তে গ্লুকোজ বাড়ে
- ইনসুলিন নিঃসরণ বেড়ে যায়
- শরীরে চর্বি জমে
এছাড়া:
- লেপটিন (ক্ষুধা কমায়) কমে যায়
- গ্রেলিন (ক্ষুধা বাড়ায়) বেড়ে যায়
ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র চার রাত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ইনসুলিনের প্রতি কোষের সংবেদনশীলতা প্রায় ১৬ শতাংশ কমে যেতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম যেসব রোগের ঝুঁকি কমায়
- ডায়াবেটিস
- উচ্চ রক্তচাপ
- হার্ট অ্যাটাক
- স্ট্রোক
- স্তন ক্যান্সার
- মলাশয়ের ক্যান্সার
- বিষণ্ণতা
- মানসিক চাপ
- বাতজনিত সমস্যা
- স্থূলতা
এছাড়া ঘুম স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং কর্মক্ষমতা উন্নত করে।
কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?
প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ সবার জন্য সাধারণভাবে:
৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
এর কম বা বেশি উভয়ই ক্ষতিকর হতে পারে।
যাদের কয়েকদিন ঘুমের ঘাটতি হয়েছে, তাদের জন্য ২০-৩০ মিনিটের দিবানিদ্রা (ন্যাপ) উপকারী হতে পারে। তবে সেটি বিকেল ৩টার আগেই হওয়া উচিত।
ঘুমানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময় রাত ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে।
স্বাস্থ্যসম্মত ঘুমের জন্য করণীয়
- শোবার ঘর শুধু ঘুমের জন্য ব্যবহার করুন।
- ঘরে টিভি, মোবাইল, কম্পিউটার না রাখাই ভালো।
- ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন।
- নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- রাতের খাবার ঘুমানোর ২-৩ ঘণ্টা আগে শেষ করুন।
- রাতের খাবারে অতিভোজন এড়িয়ে চলুন।
- ফলমূল, সবজি ও দুগ্ধজাত হালকা খাবার গ্রহণ করুন।
যদি বিছানায় যাওয়ার ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে ঘুম না আসে:
- বিছানা ছেড়ে দিন।
- বই পড়ুন।
- শিথিলায়ন ব্যায়াম করুন।
- ইতিবাচক বিষয়ে চিন্তা করুন।
যেগুলো এড়িয়ে চলবেন
- বিকেল ৩টার পর চা বা কফি পান
- ধূমপান
- মদ্যপান
- মাদকদ্রব্য
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ
- ঘুমানোর ৫-৬ ঘণ্টার মধ্যে ভারী ব্যায়াম বা ক্রীড়া
উপসংহার
বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, অপর্যাপ্ত ঘুম হৃদরোগ, বিষণ্ণতা, পারকিনসন রোগ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার ও স্ট্রোকের মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অনিদ্রা মানুষের আয়ু কমিয়ে দিতে পারে।
তাই সুস্থ, কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত জীবনযাপনের জন্য নিয়মিত, পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। সময়মতো ঘুমান, সুস্বাস্থ্য উপভোগ করুন।