মাংকিপক্স!!! কি কেন কিভাবে হয় এবং ঝুঁকি কতটুকু?
অনেকেই আতঙ্কিত। আমাদের দেশে এসে গিয়েছে কিনা? এটা কী, হলে কী হয়, আর ঝুঁকি কতটুকু?
গুটি বসন্তের (Smallpox) সর্বশেষ ন্যাচারাল কেসটি ছিল ১৯৭৮ সালে, আর বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় ১৯৮০ সালে। সেই গুটিবসন্তের জাত ভাই (অর্থোপক্সভাইরাসের) একটি সদস্য হলো মাংকিপক্স। প্রথম ১৯৫৮ সালে এই ভাইরাস বানরের মধ্যে দেখা যায়। সেখান থেকেই এর নাম হয় মাংকিপক্স।
গুটি বসন্তের টিকা দেওয়ার কারণে মানুষ মাংকিপক্সের বিরুদ্ধেও কিছুটা সুরক্ষা পেত। গুটিবসন্ত বিলুপ্ত হওয়ার পর টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে আবার কিছু কিছু এলাকায় মাংকিপক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে শুরু করে।
১৯৭০ সালে কঙ্গোতে মানুষের শরীরে প্রথম মাংকিপক্স শনাক্ত হয়। এর আগে ১৯৬৮ সালে সেখানে গুটিবসন্তকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে থেমে থেমে এই রোগের প্রকোপ দেখা যায়, যা ২০১০ সাল থেকে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২০ সালে কঙ্গোতে প্রায় ৪,৬০০টি মাংকিপক্সের কেস পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৭ সাল থেকে নাইজেরিয়ায় ৫০০-এর বেশি কেস শনাক্ত হয়েছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৭০টি কেস পাওয়া গিয়েছিল।
সাম্প্রতিক মাংকিপক্স সংক্রমিত এলাকার তথ্য-উপাত্তে জানা যায়, এর সংক্রমণজনিত মৃত্যুর হার গড়ে ৩% থেকে ৬%। আফ্রিকার যেসব গ্রামে মাঝে মাঝে এই রোগের প্রকোপ দেখা যায়, সেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল। তাই উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আফ্রিকার তুলনায় মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক কম।
সাধারণত মাংকিপক্স পশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। যেমন কাঠবিড়ালি, ইঁদুর ইত্যাদি প্রাণীর মাধ্যমে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি কুকুরের মাধ্যমে সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছিল। কুকুরটিকে এমন কিছু ইঁদুরের সঙ্গে রাখা হয়েছিল, যেখান থেকে সংক্রমণ ছড়িয়েছিল।
এবারের আউটব্রেক ভিন্ন ধরনের। কারণ আগে কখনো এত দেশে একই সময়ে ভাইরাসটি এত ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ভাইরাসটি এখন মানুষ থেকে মানুষেও সংক্রমিত হচ্ছে। ইউরোপে এমন অনেক রোগী পাওয়া গেছে, যাদের পশ্চিম আফ্রিকা ভ্রমণের কোনো ইতিহাস ছিল না।
কোয়ারেন্টাইনের সময়সীমা সাধারণত ৩০ দিন বা এক মাস।
সংক্রমিত হওয়ার ৫ থেকে ২১ দিন পর উপসর্গ শুরু হয়।
উপসর্গ কী কী?
- ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি জ্বর
- মাথাব্যথা
- শরীর, হাত ও পায়ে ব্যথা
- প্রচণ্ড ক্লান্তি
- লিম্ফ নোড (লসিকা গ্রন্থি) ফুলে যাওয়া
জ্বরের ৪-৫ দিন পর শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। এগুলো বড় বড় গুটির মতো হয়, যা কিছুটা জলবসন্ত বা চিকেনপক্সের মতো হলেও আকারে কিছুটা বড়।
সাধারণত মুখ বা যৌনাঙ্গে শুরু হয়ে পরে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
কীভাবে ছড়ায়?
কোভিড-১৯ এর তুলনায় সংক্রমণের হার এখনো অনেক কম, তবে শূন্য নয়।
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হতে পারে:
- আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকের গুটির সংস্পর্শে এলে
- আক্রান্তের ব্যবহৃত কাপড় বা বিছানার চাদরের মাধ্যমে
- কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে
সেক্সুয়াল ট্রান্সমিশন নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলেও এর সম্ভাবনার কথা আলোচনা করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন:
- রোগীর সঙ্গে বসবাসকারী পরিবারের সদস্যরা
- রোগীর কাপড় বা বিছানা পরিষ্কার করেন যারা
- স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা
তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিই ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোগের জটিলতা
অধিকাংশ মানুষ ২ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে কোনো বড় জটিলতা ছাড়াই সুস্থ হয়ে যান।
তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের জটিলতাগুলো দেখা দিতে পারে:
- নিউমোনিয়া
- এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের সংক্রমণ)
- চোখের সংক্রমণ, বিশেষ করে কর্নিয়ার সমস্যা
- সেপসিস
আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় এসব জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব।
চিকিৎসা
বেশি করে পানি পান করা এবং প্যারাসিটামল সেবনের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে যায়।
জটিলতা দেখা দিলে বিশেষ ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।
Tecovirimat নামে একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওষুধ রয়েছে, যা আগে স্মলপক্সের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল। বর্তমানে ইউরোপিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন সীমিত আকারে এই ওষুধের অনুমোদন দিয়েছে। তবে এটি এখনো বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্য নয়।
স্মলপক্সের ভ্যাকসিন প্রায় ৮৫% সুরক্ষা দিতে পারে। তবে ৪০ বছরের নিচের অধিকাংশ মানুষ এই টিকা পাননি।
মাংকিপক্স প্রতিরোধে আগেও একটি ভ্যাকসিন ছিল, যদিও এর উৎপাদন সীমিত।
এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর অজানা
নতুন এই আউটব্রেক নিয়ে অনেক বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।
- এটি কি নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্ট?
- কেন আগের চেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে?
- বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি কতটা সংক্রামক?
- মৃত্যুহার কত হতে পারে?
- স্মলপক্স ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর থাকবে?
- এটি কি মহামারির রূপ নিতে পারে?
সময়ই এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে, যেমনটি কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)