মুহসীনিন বইয়ের শরঈ সম্পাদকীয় ভুমিকার একাংশ
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে একজন আদর্শ পুরুষের কতিপয় বৈশিষ্ট্য
১. আল্লাহভীরু ও সচ্চরিত্রবান
যে পুরুষের মাঝে আল্লাহর ভয় আছে, আছে উত্তম চরিত্র এবং চোখ-জিহ্বার সংযম, সেই আদর্শ পুরুষ।
২. বিনয়ী ও লজ্জাশীল
যে পুরুষ নিজ চরিত্রে বিনয় ও লজ্জার গুণের সমন্বয় করে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
“রহমানের বান্দা (পরম করুণাময় আল্লাহর বান্দা) তারাই, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলা-ফেরা করে।”
[সুরা ফুরকান: ৬৩]
নবী ﷺ বলেন,
“যে কেউ আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।”
[সহীহ মুসলিম: ৬৭৫৭]
ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,
عَنِ ابنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنهُمَا: أنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ مَرَّ عَلَى رَجُلٍ مِنَ الأنْصَار وَهُوَ يَعِظُ أخَاهُ في الحَيَاءِ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: «دَعْهُ، فَإنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الإيمَانِ».
রাসূলুল্লাহ ﷺ এক আনসার ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যিনি তার ভাইকে লজ্জার ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন,
“তাকে ছেড়ে দাও। কেননা, লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।”
[সহীহ বুখারী: ২৪, ৬১১৮; সহীহ মুসলিম: ৩৬; সুনানে তিরমিযী: ২৬১৫; সুনানে নাসাঈ: ৫০৩৩; সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৯৫; মুসনাদে আহমদ: ৪৫৪০, ৫১৬১, ৬৩০৫; মুয়াত্তা মালিক: ১৬৭৯]
রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত,
إذا لم تستحي فاصنع ما شئت
“যখন তুমি লজ্জা করবে না, তখন যা ইচ্ছা তাই কর।”
(অর্থাৎ যখন লজ্জা নাই, তখন সকল প্রকার মন্দই সমান।)
[সহীহ বুখারী: ৩৪৮৩; সহীহ ইবনু হিব্বান: ৬০৭; আত তামহীদ, ইবনু আব্দিল বার ২০/৬৮]
৩. হক আদায়ে সচেতন
যে পুরুষ শত ব্যস্ততা ও বিরূপ পরিস্থিতিতেও নিজ পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীর হক আদায় করে। পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানকেও যথেষ্ট সময় দেয়।
৪. সর্বক্ষেত্রে সচ্চরিত্রবান
যে পুরুষ স্ত্রী, পরিবার এবং পরিবারের বাইরেও সচ্চরিত্র ও নীতিবান।
হযরত আবু হুরায়রা (রাদি.) সূত্রে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন,
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ خُلُقًا
“আদর্শ মানুষ ও পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার ওই ব্যক্তি, যার চরিত্র সুন্দর এবং সে তার স্ত্রীর কাছে ভালো।”
[সুনানে তিরমিযী: ১১৬২, ১১৯৫; আত তারগীব ওয়াত তারহীব ৩/৩৫৮; সুনানে আবী দাউদ: ৪৬৮২; মুসনাদে আহমাদ ২/৪৭২]
নবী ﷺ উত্তম চরিত্রের বিষয়ে আল্লাহর কাছে বলতেন,
اللَّهُمَّ إنِّي أَسْأَلُكَ الهُدَى وَالتُّقَى، وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى. وفي روايةٍ: وَالْعِفَّةَ
“হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট হেদায়েত, আল্লাহর ভয়, সচ্চরিত্র ও অভাবমুক্তির প্রার্থনা করছি।”
[সহীহ মুসলিম: ২৭২১]
৫. সংযতভাষী
আদর্শ পুরুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেশি কথা বলে না। এতে তার মাঝে এক ধরনের ভাবগাম্ভীর্য বজায় থাকে। একই সঙ্গে সে স্পষ্টভাষীও হয়।
হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেন,
الْحَيَاءُ وَالْعِيُّ شُعْبَتَانِ مِنَ الْإِيمَانِ وَالْبَذَاءُ وَالْبَيَانُ شُعْبَتَانِ مِنَ النِّفَاقِ
“লজ্জা ও অল্প কথা বলা ঈমানের দুটি শাখা। আর অশ্লীলতা ও বাকপটুতা মুনাফিকের শাখা।”
[তিরমিযী: ২০২৭; আত তারগীব ওয়াত তারহীব: ২৬২৯; মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবাহ: ৩০৪২৮; মুসনাদে আহমাদ: ২২৩১২; মুসতাদরাকে হাকেম: ১৭, ১৭০; শু‘আবুল ঈমান, বাইহাক্বী: ৭৭০৬; আল জামিউস সগীর: ৩২০১]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন,
لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ، وَلَا اللَّعَّانِ، وَلَا الْفَاحِشِ، وَلَا الْبَذِيءِ
“মুমিন কটুভাষী হতে পারে না, লা‘নতকারী হতে পারে না এবং অশ্লীল ও অশালীন কথা বলতে পারে না।”
[আল আদাবুল মুফরাদ: ৩১২; জামে তিরমিযী: ১৯৭৭]
৬. রাগ সংযমকারী ও সদাচারী
আদর্শ পুরুষ অহংকারী, হিংসুক, বদমেজাজি ও কঠোর প্রকৃতির হয় না। পাশাপাশি প্রবল রাগের সময়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
নবী করীম ﷺ বলেন,
“কাউকে আছড়ে ফেলে দেওয়ার নাম শক্তি নয়; বরং (পুরুষের) আসল শক্তি হচ্ছে প্রবল রাগের মাঝেও নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা।”
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
[সহীহ মুসলিম: ৬৮০৯]
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন,
“মুমিন সবার আপন হয়। যে অন্তরঙ্গ হয় না এবং যার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়া যায় না, তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই।”
الْمُؤْمِنُ مَأْلَفٌ، وَلَا خَيْرَ فِيمَنْ لَا يَأْلَفُ وَلَا يُؤْلَفُ
[মুসনাদে আহমাদ: ৯১৯৮]
৭. গাইরতমন্দ ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন
আদর্শ পুরুষ গাইরতমন্দ ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন হয়ে থাকে।
সা'দ ইবনে উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রচণ্ড আত্মর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। একবার তিনি মন্তব্য করেন,
“যদি কোনোদিন ঘরে এসে আমার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোনো পুরুষকে দেখি, তাহলে নিঃসন্দেহে এক কোপে তার গর্দান ফেলে দিব।”
হযরত সা'দের এই বক্তব্য নবী ﷺ শুনতে পেয়ে বলেন,
“তোমরা সা'দের গাইরাত দেখে আশ্চর্য হচ্ছো? অবশ্যই আমার গাইরাত সা'দের চেয়ে বেশি। আর আল্লাহ তাআলার গাইরাত আমার চেয়েও বেশি।”
قَالَ سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ لَوْ رَأَيْتُ رَجُلًا مَعَ امْرَأَتِي لَضَرَبْتُهُ بِالسَّيْفِ غَيْرَ مُصْفَحٍ ... أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ، لأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ، وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي
[সহীহ বুখারী: ৬৮৪৬]
নবীজি ﷺ বলেন,
“নিশ্চয় আল্লাহ তাআলার গাইরাত আছে। আল্লাহর গাইরাত হলো, মুমিন যেন হারাম কোনো কাজে লিপ্ত না হয়।”
إِنَّ اللَّهَ يَغَارُ وَغَيْرَةُ اللَّهِ أَنْ يَأْتِيَ الْمُؤْمِنُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ
[সহীহ বুখারী: ৫২২৩; সহীহ মুসলিম: ২৭৬২; মুসনাদে আহমাদ: ৯০৩৮]
৮. শক্তিশালী, ধৈর্যশীল ও কর্মঠ
আদর্শ পুরুষ ধৈর্যশীল, শৌর্যবীর্য ও বীরত্বের অধিকারী এবং মেহনতি। আদর্শ মুমিন পুরুষ বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই শক্তিশালী হয়ে থাকে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ، وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ...
“শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিন অপেক্ষা প্রিয় ও উত্তম। তবে উভয়ের মাঝেই কল্যাণ রয়েছে। তোমাকে যা উপকৃত করবে সে বিষয়ে অনুরাগী হও। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। অক্ষম হয়ে যেয়ো না...”
[সহীহ মুসলিম: ২৬৬৪]
৯. বিচক্ষণ ও প্রতারণামুক্ত
আদর্শ পুরুষ কখনো দুর্বলদের দুর্বলতার সুযোগ নেয় না। কাউকে ধোঁকাও দেয় না। আবার নিজেও ধোঁকা খায় না।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন,
لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ
“মুমিন একই গর্তে দুইবার দংশিত হয় না।”
(অর্থাৎ বারবার ধোঁকা খায় না।)
[সহীহ বুখারী: ৬১৩৩; সহীহ মুসলিম: ২৯৯৮]
১০. উদার ও সহজ-সরল
আদর্শ মুমিন পুরুষ কপট ও সংকীর্ণ মানসিকতার হতে পারে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে সে একদম সহজ-সরল ও উদার হবে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ غِرٌّ كَرِيمٌ، وَالْفَاجِرُ خَبٌّ لَئِيمٌ
“মুমিন সহজ-সরল, উদার হয়ে থাকে। আর ফাজের (পাপিষ্ঠ) হয়ে থাকে ঠকবাজ ও সংকীর্ণমনা।”
[আল আদাবুল মুফরাদ: ৪১৮; সুনানে আবী দাউদ: ৪৭৫৭; জামে তিরমিযী: ১৯৬৪; মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৯৪ হা. ৯১১৮; হাদীসের সনদ হাসান]